ঝালকাঠিতে ‘এথিস্ট নোট’ ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মামলা: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম ধর্মীয় অনুভূতির সংঘাত

কামরুল ইসলাম, আদালত প্রতিবেদক ঝালকাঠি

বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যকার টানাপোড়েন নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সংঘাত আরও তীব্র ও জটিল রূপ ধারণ করেছে। তারই একটি নতুন উদাহরণ দেখা গেল ৪ জানুয়ারি ঝালকাঠির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের হওয়া একটি ধর্ম অবমাননার মামলার মাধ্যমে। “এথিস্ট নোট” নামক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রকাশক ও লেখকদের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মামলার পটভূমি

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি দায়ের করেন ঝালকাঠি জেলার বাসিন্দা নজীর আহমেদ। তিনি আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগ করেন যে “এথিস্ট নোট” ওয়েবসাইটে নিয়মিতভাবে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে লেখা প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব লেখায় ইসলাম সম্পর্কে মিথ্যাচার, কুরুচিপূর্ণ ভাষা এবং অবমাননাকর বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

বাদীর বক্তব্য অনুযায়ী, এইসব লেখা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লক্ষাধিকবার শেয়ার হয়েছে এবং তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এর ফলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ ও মানসিক আঘাত সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আইনি কাঠামো ও অভিযোগ

মামলাটি দণ্ডবিধি ১৮৬০ (সংশোধিত) এর ২৯৫ ও ২৯৫(ক) ধারায় দায়ের করা হয়েছে। এই ধারাগুলো ধর্ম অবমাননা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং উপাস্য বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি ইচ্ছাকৃত অবমাননার বিষয়কে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে।

মামলার নম্বর আদালত সূত্রে জানা গেছে সি.আর.–৩/২৬। এতে মোট ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। প্রধান আসামি হিসেবে নাম রয়েছে লেখক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইনের। এছাড়া অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন রাজীব সাহা, সৈয়দ আরিফ মাসুদ, মিজানুর রহমান, এম ডি সাব্বির আহমেদ, এম ডি সামিউল আলম, মোহাম্মদ আল মামুর, সমীর হালদার, নুরুল আমিন, এম ডি জাকির হোসেন, হামজা রহমান অন্তরসহ আরও অনেকে।

আদালতের আদেশ

ঝালকাঠির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলার আবেদন গ্রহণ করে তা নথিভুক্ত করেন এবং তদন্তের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি)-কে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ডিবিকে প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন) দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, “এথিস্ট নোট” প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর লেখা প্রকাশের অভিযোগ রয়েছে।

ডিবির প্রতিক্রিয়া

ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন,
“এই ধরনের অভিযোগ আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো কোনো অপরাধকে আমরা প্রশ্রয় দিই না।”

অভিযুক্তদের অবস্থান

“এথিস্ট নোট”-এর প্রকাশক রাসেল মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

এই মামলা আবারও বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুভূতি, ব্লাসফেমি আইন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ককে সামনে এনেছে। একদিকে ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর দাবি—ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন ও মুক্তচিন্তার পক্ষের মানুষ মনে করেন, এই ধরনের মামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

উপসংহার

এই মামলা শুধু একটি ওয়েবসাইট বা কয়েকজন লেখকের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। এটি বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্ম, আইন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জটিল সম্পর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের ফল এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই ঘটনার প্রভাব কতদূর বিস্তৃত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *